পান্ডবা নির্জলা একাদশীর মাহাত্ম্য, সংকল্প ও পারণ মন্ত্র_1

পান্ডবা নির্জলা একাদশীর মাহাত্ম্য, সংকল্প ও পারণ মন্ত্র

1 min


235
204 shares, 235 points

এই অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করেছি পান্ডবা নির্জলা একাদশীর মাহাত্ম্য, সংকল্প ও পারণ মন্ত্র। একাদশীতে পূর্ণ উপবাস। ত্রিস্পৃশা মহা দ্বাদশী।

পান্ডবা নির্জলা একাদশীর সময়সূচী ও পারন মুহূর্ত 

বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৭ শে জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ইং ১১ই জুন ২০২২ শনিবার পবিত্র পান্ডবা নির্জলা একাদশী। ভোরে স্নান সেরে ভগবানের সম্মুখে সঙ্কল্প মন্ত্র পাঠ করবেন।

পারনঃ পান্ডবা নির্জলা একাদশীর পরের দিন অর্থাৎ রবিবার সকাল ০৫:১০ থেকে ০৯:৪২ মি: মধ্যে ঢাকা, বাংলাদেশ সময় এবং সকাল ০৪:৫১ থেকে ০৯:২১ মি: মধ্যে কলকাতা, ভারত সময়। ভোরে স্নান সেরে পারন মন্ত্র পাঠ করে একাদশীর ফল ভগবানের নিকট অবশ্যই অর্পণ করবেন, নচেৎ পূর্ণ একাদশীর ফল লাভ থেকে বঞ্চিত থেকে যাবেন।

পান্ডবা নির্জলা একাদশী সংকল্প মন্ত্র 

একাদশীর দিন ভগবান কৃষ্ণের সম্মুখে আমরা অবশ্যই সংকল্প নেব –

একাদশ্যাম্‌ নিরাহারঃ স্থিতা অহম্ অপরেহহনি।

ভোক্ষ্যামি পুন্ডরীকাক্ষ স্মরনম্‌ মে ভবাচ্যুত।।

অনুবাদ :  হে পুন্ডরীকাক্ষ! হে অচ্যূত! একাদশীর দিন উপবাস থেকে এই ব্রত পালনের উদ্দেশ্যে আমি আপনার স্মরণাপন্ন হচ্ছি।

পান্ডবা নির্জলা একাদশী পারন মন্ত্র 

একাদশী তিথির পরদিন উপবাস ব্রত ভাঙার পর অর্থাৎ, উপবাসের পরদিন সকালে যে নির্দিষ্ট সময় দেওয়া থাকে, সেই সময়ের মধ্যে পঞ্চ রবিশস্য ভগবানকে ভোগ নিবেদন করে একাদশীর পারণ মন্ত্র তিনবার ভক্তিভরে পাঠ করতে হয়। এরপর প্রসাদ গ্রহণ করে পারণ করা একান্ত ভাবে দরকার, নতুবা একাদশীর পূর্ণ ফল লাভ হবে না। আর অবশ্যই একাদশীর আগের দিন ও পরের দিন নিরামিষ প্রসাদ গ্রহণ করতে হবে। 

একাদশীর পারণ মন্ত্রঃ —

অজ্ঞান তিমিরান্ধস্য ব্রতেনানেন কেশব।

প্রসীদ সুমুখ নাথ জ্ঞানদৃষ্টিপ্রদো ভব॥

—- (বৃ: না: পু: ২১/২০)

অনুবাদ :  হে কেশব! আমি অজ্ঞানরূপ অন্ধকারে নিমজ্জিত আছি। হে নাথ! এই ব্রত দ্বারা আমার প্রতি প্রসন্ন হয়ে আমাকে জ্ঞানচক্ষু প্রদান করুন।

এছাড়াও আরও জানুন – একাদশী ব্রত কেন করা উচিত? একাদশীর আবির্ভাব কীভাবে হয়েছিল ? শুদ্ধভাবে একাদশী পালনের নিয়মাবলী। একাদশীতে কি আহার গ্রহণ করবেন? সব কিছু জানতে আরও পড়ুন: একাদশী ব্রত মাহাত্ম্য ও শুদ্ধভাবে একাদশী পালনের নিয়মাবলী

পান্ডবা নির্জলা একাদশীর মাহাত্ম্য, সংকল্প ও পারণ মন্ত্র_2

পান্ডবা নির্জলা একাদশীর মাহাত্ম্য কথা

জ্যৈষ্ঠ শুক্লপক্ষের পান্ডবা নির্জলা একাদশী ব্রত সম্পর্কে ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে ‘শ্রীভীমসেন-ব্যাসসংবাদে’ সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে। মহারাজ যুধিষ্ঠির ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে বললেন, “হে জনার্দন! আমি অপরা একাদশীর সমস্ত মাহাত্ম্য শ্রবণ করলাম, এখন জ্যৈষ্ঠ শুক্লপক্ষের একাদশীর নাম ও তার মাহাত্ম্য কৃপা করে আমাকে বর্ণনা করুন।”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন, এই একাদশীর কথা মহর্ষি ব্যাসদেব তোমাকে বর্ণনা করবেন, কারন তিনি সর্বশাস্ত্রের অর্থ ও তত্ত্ব সম্পূর্ণরূপে জানেন। রাজা যুধিষ্ঠির ব্যাসদেবকে অনুরোধ করলেন “হে মহর্ষি দ্বৈপায়ন! আমি মানুষের লৌকিক ধর্ম এবং জ্ঞানকাণ্ডের বিষয়ে অনেক কথা শ্রবণ করেছি। আপনি যথাযথভাবে ভক্তিবিষয়িনী কিছু ধর্মকথা এখন আমায় বর্ণনা করুন।”

শ্রীব্যাসদেব স্মিত হেসে বললেন “হে মহারাজ! তুমি যেসব ধর্মকথা শুনেছ এই কলিযুগের মানুষের পক্ষে সে সমস্ত পালন করা অত্যন্ত কঠিন। যা সুখে, সামান্য খরচে, অল্প কষ্টে সম্পাদন করা যায় অথচ মহাফল প্রদান করে এবং সমস্ত শাস্ত্রের সারস্বরূপ সেই ধর্মই কলিযুগে মানুষের পক্ষে করা শ্রেয়। সেই ধর্মকথাই এখন আমি বলছি, মন দিয়ে তা শ্রবণ করো।”

উভয় পক্ষের একাদশী দিনে সারাদিন ও সারারাত ভোজন না করে উপবাস ব্রত করবে। পরদিন অর্থাৎ দ্বাদশী দিনে স্নান করে শুচিশুদ্ধ হয়ে নিত্যকৃত্য সমাপনের পর শ্রীকৃষ্ণের অর্চন করবে। এরপর ব্রাহ্মণদেরকে প্রসাদ ভোজন করাবে। অশৌচাদিতেও এই ব্রত কখনও ত্যাগ করবে না। যে সকল ব্যক্তি স্বর্গে যেতে চায়, তাদের সারা জীবন এই ব্রত পালন করা উচিত। পাপকর্মে রত ও ধর্মহীন ব্যক্তিরাও যদি এই একাদশী দিনে ভোজন না করে, তবে তারাও যমযন্ত্রণা থেকে রক্ষা পায়।”

মহর্ষি ব্যাসদেবের এসব কথা শুনে গদাধর ভীমসেন অশ্বত্থ পাতার মতো থরথর করে কাঁপতে লাগলেন ও শুষ্ক কণ্ঠে আবেদন জানালেন, “হে মহাবুদ্ধি পিতামহ! মাতা কুন্তী, দ্রৌপদী, ভ্রাতা যুধিষ্ঠির, অর্জুন, নকুল ও সহদেব এরা কেউই একাদশীর দিনে ভোজন করে না। আমাকেও অন্ন গ্রহণ করতে নিষেধ করে। কিন্তু দুঃসহ ক্ষুধাযন্ত্রণার জন্য আমি উপবাস করতে পারি না।”

ভীমসেনের স্পষ্ট ও সরল কথায় যে যন্ত্রণা লুকিয়ে ছিল শ্রীব্যাসদেব তা আঁচ করে বললেন, “যদি স্বর্গাদি দিব্যধাম লাভে তোমার একান্ত ইচ্ছা থাকে, তবে উভয় পক্ষের একাদশীতে ভোজন করবে না।”

তদুত্তরে ভীমসেন বিনতির সুরে বললেন, “আমার নিবেদন এই যে, উপবাস তো দূরের কথা, দিনে একবার ভোজন করে থাকাও আমার পক্ষে অসম্ভব। কারণ আমার উদরে ‘বৃক’ নামক অগ্নি রয়েছে। ভোজন না করলে কিছুতেই সে শান্ত হয় না। তাই প্রতিটি একাদশী পালনে আমি একেবারেই অপারগ। হে মহর্ষি! বছরে একটি মাত্র একাদশী পালন করে যাতে আমি দিব্যধাম লাভ করতে পারি এরকম কোন একাদশীর কথা আমাকে নিশ্চয় বলুন।”

তখন ব্যাসদেব একটি উপায় গম্ভীরতার সাথে বললেন, “জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিতে নির্জলা থেকে অর্থাৎ জলপান না করে সম্পূর্ণ দিন ও সম্পূর্ণ রাত উপবাস থাকবে। তবে আচমনে দোষ হবে না। ঐদিন অন্নাদি গ্রহণ করলে ব্রত ভঙ্গ হবে।”

একাদশীর দিন সূর্যোদয় থেকে দ্বাদশীর দিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত জলপান বর্জন করলে অনায়াসে বারোটি একাদশীর ফল লাভ হয়। বছরের অন্যান্য একাদশী পালনে অজান্তে যদি কখনও ব্রতভঙ্গ হয়ে যায়, তা হলে এই একটি মাত্র একাদশী পালনে সেই সব দোষ দূর হবে। দ্বাদশী দিনে ব্রাহ্মমুহূর্তে স্নানাদিকার্য সমাপ্ত করে শ্রীহরির পূজা করবে। সদাচারী ব্রাহ্মণদের বস্ত্রাদি দানসহ ভোজন করিয়ে আত্মীয়স্বজন সঙ্গে নিজে ভোজন করবে। এরূপ একাদশী ব্রত পালনে কি প্রকার পুণ্য সঞ্চিত হয়, এখন তা শ্রবণ কর।

সারা বছরের সমস্ত একাদশীর ফলই এই একটি মাত্র ব্রত উপবাসে লাভ করা যায়। শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্মধারী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাকে বলেছেন, “বৈদিক ও লৌকিক সমস্ত ধর্ম পরিত্যাগ করে যারা শুধুমাত্র আমার শরণাপন্ন হয়ে এই নির্জলা একাদশী ব্রত পালন করে তারা সর্বপাপ মুক্ত হয়। যদিও কলিযুগে ধন-সম্পদ দান করে সদ্গতি লাভ করতে পারবে না বা স্মার্ত সংস্কারের মাধ্যমেও যথার্থ কল্যাণ লাভ করতে পারবে না। কলিযুগে দ্রব্যশুদ্ধির বালাই নেই। কলিকালে শাস্ত্রে বর্ণিত সংস্কারবিধি বিশুদ্ধ পদ্ধতিতে হবে না। তাই বৈদিক ধর্ম কখনও সুসম্পন্ন হতে পারবে না। হে ভীমসেন! তোমাকে বহু কথা বলার আর প্রয়োজন কি? তুমি উভয় পক্ষের একাদশীতে ভোজন করবে না। যদি তাতে অসমর্থ হও তবে জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশীতে অবশ্যই নির্জলা উপবাস করবে। এই একাদশী ব্রত ধনধান্য ও পুন্যদায়িনী। যমদূতগণ এই ব্রত পালনকারীকে মৃত্যুর পরও স্পর্শ করতে পারে না। পক্ষান্তরে বিষ্ণুদূতগণ তাঁকে বিষ্ণুলোকে নিয়ে যান।”

শ্রীভীমসেন ঐদিন থেকে নির্জলা একাদশী পালন করতে থাকেন, তারপর থেকে এই একাদশী ‘পাণ্ডবা নির্জলা একাদশী’ বা ‘ভীমসেনী একাদশী’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। এই নির্জলা একাদশীতে পবিত্র তীর্থে স্নান, দান, জপ, কীর্তন ইত্যাদি যা কিছু মানুষ করে তা অক্ষয় হয়ে যায়। যে ব্যক্তি ভক্তিসহকারে এই একাদশী মাহাত্ম্য পাঠ বা শ্রবণ করেন তিনি বৈকুণ্ঠধাম প্রাপ্ত হন।

প্রত্যেক বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের পান্ডবা নির্জলা একদশীটি সবাই পালন করুন – কারন, সারাবছর যদি আপনি একটিও একাদশী না করতে পারেন সেক্ষেত্রে সকল একাদশী ব্রতের ফল এই পান্ডবা নির্জলা একাদশীতে পাবেন ।

ত্রিস্পৃশা মহা দ্বাদশী

শাস্ত্রমতে প্রথমে একাদশী তারপর সমস্ত দিন দ্বাদশী এবং রাত্রিশেষে ত্রয়োদশী হলে তা ‘ত্রিস্পৃশা’ নামে অভিহিত হয়ে থাকে। শ্রীহরির বিশেষ প্রিয় এই মহাপূণ্য তিথিতে সযত্নে উপবাস করা কর্তব্য। এই ব্রতের পারণ ত্রয়োদশীতে করতে হয়।

পদ্মপুরাণে শ্রীসনৎকুমার-বেদব্যাস সংবাদে এই ব্রতের মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে। সনৎ কুমার বললেন, “সর্বপাপবিনাশিনী এই ত্রিস্পৃশা মহাব্রত সকলেরই পালন করা উচিত।

চক্রধারী ভগবান বিষ্ণু ক্ষীরসমুদ্রে শিব, ব্রহ্মা ও আমার কাছে এই ব্রত সম্পর্কে বলেছিলেন। জড় বিষয়ে অত্যন্ত আসক্ত ব্যক্তিও যদি এই ব্রত পালন করে, তবে তারা মুক্তিলাভের যোগ্য হয়। হে মুনিবর! বারাণসীতে ও প্রয়াগে মৃত্যু হলে এবং গোমতীতে স্নান করলে মানুষের মুক্তি লাভ হয়।”

একসময় শ্রীজাহ্নবী ভগবান মাধবের কাছে এসে বললেন, “হে হৃষীকেশ! কলিযুগের মহাপাপী মানুষ যখন আমার জলে স্নান করবে, সেই পাপে আমি কলুষিত হয়ে পড়ব। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কি?”

শ্রীমাধব স্মিত হেসে বললেন, “হে গঙ্গে! সর্বকলুষ বিনাশী এই ত্রিস্পৃশা ব্রত তুমি পালন কর।” ভগবানের নির্দেশে গঙ্গাদেবী এই ত্রিস্পৃশা ব্রত পালন করে কলির কলুষ থেকে মুক্ত হন।

হে মুনিবর! বিষয় অনুরাগী ব্যক্তি কিংবা বিষয় অনাসক্ত, উভয়ের পক্ষে মুক্তি লাভ করা কঠিন। তাই মুক্তিদানকারী এই ত্রিস্পৃশা ব্রতের অনুষ্ঠান করা কর্তব্য।

হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে ।
হরে রাম, হরে রাম, রাম রাম হরে হরে ।।

হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করুন সুখী হোন। _____শ্রীল প্রভুপাদ!


Like it? Share with your friends!

235
204 shares, 235 points

Join Our Community List

Community grow with You. * VERIFY & CONFIRM YOUR EMAIL *

Thanks for your interest joining to Bangla Kobita Club community.

Fill the Correct Information.

Thanks for your interest joining to Bangla Kobita Club community.

Something went wrong.

Subscribe to Join Our Community List

Community grow with You. [Verify and Confirm your Email]